Bangla News Line Logo
bangla fonts
৪ আশ্বিন ১৪২৬, বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২:৩৭ অপরাহ্ণ
facebook twitter google plus rss
সর্বশেষ
নেত্রকোণায় গৃহবধূ ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার প্রশাসন সেই নারীর দায়িত্ব নেয়ার পর চিকিৎসা শুরু পূর্বধলায় আলোর ফেরিওয়ালা বিদুৎসংযোগ:১২৬ বাড়ি আলোকিত নেত্রকোণায় বাউল সাধক রশিদ উদ্দিনের স্মরণ উৎসব নেত্রকোণায় দুর্গাপুজা উদযাপনে সভা

স্মৃতির জানালায় কিংবদন্তি হুমায়ুন আহম্মেদ


বাউল ইসলাম উদ্দিন


স্মৃতির জানালায় কিংবদন্তি হুমায়ুন আহম্মেদ

১৯৯৭ সালের ১৩ ই নভেম্বর। ডক্টর হুমায়ুন আহম্মেদ স্যারের ৪৯ তম জন্মবার্ষিকী। হুমায়ুন স্যার কামরুল নামের একটি ছেলেকে ডেকে পাঠালেন আমাকে ঢাকা নেওয়ার জন্য। কামরুল হুমায়ুন স্যারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে ১২ তারিখ আসে। তার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি, স্যারের জন্মদিনে আমাকে গান গাইতে হবে। এমন একজন গুনী মানুষের জন্মদিনে আমি গান গাইব শুনে আমার আর আনন্দের সীমা রইল না। কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে কৌতুহল জাগে, স্যারের কাছে কখন যাব, জন্মদিনে কি গান গাইব, এই রকম নানা প্রশ্ন। ১৩ তারিখ আমার ঢুলি কালাচান, হারমোনিয়াম বাদক রনজু মিয়া মন্দিরা বাদক মোন্নাফ মিয়া ও বংশী বাদক কাঞ্চন মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কামরুলের সঙ্গে ঢাকা রওনা হই। বিকাল ৩ টার মধ্যে আমরা ঢাকা পৌছে যাই। কামরুলকে নিয়ে আমরা চলে যাই আমার পূর্ব পরিচিত হুমায়ুন স্যারের ধানমন্ডির বাড়িতে। আমাদেরকে পৌঁছে দিয়ে কামরুল কাট মারল। আমরা ঝিম ধরে নিচ তলায় ড্রয়িং রুমে বসে রইলাম। পাঁচ-সাত মিনিট পরেই বাড়ির পরিচারিকা এসে আমদেরকে এক নজর দেখে কিছু না বলেই চলে গেল। স্যার অন্য একটি রুমে লেখা লেখি করছেন। কিছুক্ষন পর আমাদেরকে ডাকা হল স্যারের রুমে যাওয়ার জন্য। আমরা সবাই সেখানে গিয়ে স্যার ও তাঁর সহধর্মিনি (গুলতেকিন আহমেদ) কে পা ছুঁয়ে সালাম করে পাশে দাঁড়ালাম। স্যার আমাদেরকে পাশের একটি সোফায় বাসার ইঈিত দিলেন। আমাকে বললেন, চা-নাস্তা খেয়ে কুতুবপুরের ভাইসাব আইছইন ভাবিরে লইয়া, এই গানটি শুনাও। আমরা চা-নাস্তা খেয়ে এই গানটি শোনাই।
গানের কথা :
কুতুবপুররে ভাইসাব আইছইন ভাবীরে লইয়া
কই গেলেরে মিনা আর হেনা তাড়তাড়ি দেখ আইয়া ।। ঐ
                খবর কও গেয়া দাদুর কাছে
                সাথে আরও মে’মান আছে
                তাড়াতাড়ি পূবের ঘরে বিছনাডা দে বিছাইয়া ।। ঐ
এটি আমার রচিত একটি গান। বাহুল্য ভয়ে গানের সব কথা এখানে আর দেওয়া হল না। এই গানটি ১৯৯৩ সালে স্যারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে স্বস্ত্রীক যখন আসেন তখন আমি স্যার ও ভাবিকে নিয়ে তাৎক্ষণিক রচনা করে গেয়েছিলাম। স্যারের জীবদ্দশায় এই গানটি শতাধিক বার আমার কন্ঠে শুনেছেন। সে দিন সেই গানটি শোনায়ে আমরা বিশ্রামের জন্য চলে গেলাম পাঁচ তলায়। স্যার বাহিরের কোথায় চলে গেলেন, কি যেন একটা বাঁশির সুর রেকডিং করতে। মূল গানের অনুষ্টান সন্ধ্যায় দিন মনি অস্ত যাওয়ার পূর্বেই অনেক গেস্ট ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে আসতে লাগলেন। ফুল ছাড়াও অনেক উপঢৌকন নিয়ে আসছেন অনেকেই। ইতোমধ্যে ঘরের এককোণ ভরে গেছে পুষ্পস্তবকে। পলাশ, গাঁদা, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপের ছড়াছড়ি। বসার ঘরে ডাইনিং টেবিলে বিশাল বড়  আকারের কেক। সাদা ও বেগুনী রংয়ের কেকের উপর গোলাপী বর্ণের লেখা শুভজন্মদিন। সন্ধ্যা সমাগত। কিছুক্ষন পরেই শুরু হবে গান। হঠাৎ চেয়ে দেখি পাশেই বসে আছেন আমার অত্যান্ত প্রিয় মানুষ বেলাল বেগ (শিক্ষক, সাবেক টিভি প্রযোজক ও গন সংযোগ কর্মী) তাঁর সঙ্গে আছেন আরও তিনজন সাংবাদিক। এমন একজন গুনী  মানুষের জন্মদিনে বেলাল বেগ সাহেবকে পেয়ে আমার আনন্দটা আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল। তিনি গান খুব পছন্দ করেন। সন্ধ্যা ৭টার কাছাকাছি অনেক লোকজন এসেছেন সেখানে। একটু পরেই শুরু হবে গান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্যারের তনয় নোহাশ চলে এলেন স্যারের কাছে। নোহাশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্যার, সবার উদ্দেশ্যে বলেন, প্রিয় সুধী মন্ডলী, এখন আপনাদের সম্মুখে প্রদর্শীত হবে নূহাশের একক চিত্র প্রদর্শনী। নূহাশ তখন  একটি ছোট বালক। তার কল্পনায়, তিমি, সাপ, ক্যাকটাস, হরিণ, অক্টোপাস ইত্যাদি চিত্রকর্ম দিয়ে সত্যিই অবাক করে দিলেন সবাইকে। সেদিন সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন স্যারের  অনুগত  ছাত্র শিল্পী সেলিম চৌধুরী, তুহিন প্রমুখ। শুরু হল গান। আমাকে বলা হল জন্মদিনের গান গাওয়ার জন্য। কেক কাটার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার বেহালা কাধে নিয়েই শুরু করলাম গান।
স্যারের শুভজন্মদিন (২)
তিনিত কলম জাদুকর তুলনা বিহীন!!ঐ
১৯৪৮ সনে
এসেছিলেন এই ভুবনে
শুভদিনে শুভক্ষনে ১৩ নভেম্বর এই দিন !!ঐ

তোমার সৃষ্টি কর্ম কাজে
তোমার তুলনা তুমিই নিজে
কোটি ভক্ত হৃদয় মাঝে
        বেঁচে থাকবে চিরদিন !!ঐ
আজকে তোমার জন্মদিনে
কি দেব তাই ভাবছি মনে
বসাইলাম হৃদয় আসনে
           কয় বাউল ইসলাম উদ্দিন !!ঐ

তারপর তোমরা শুনে যাও খবর, একজন কলম যাদুকর, নেত্রকোণায় জন্ম গেল হইয়া।এই গানটি পরিবেশন করি। একে একে আমি গাছের গান, মাছের গান, সখিগো আমার মন ভালানা, কালার সাথে পিড়িত কইরা সুখ পাইলাম না, এই সমস্ত গান পরিবেশন করি। শেষ গানটি গাওয়ার সময় স্যার আমাকে বললেন, আজ এই অনুষ্ঠানে আমার একজন বন্ধু এসেছেন তার দেশ নেদারল্যান্ড নাম মিঃ ফাকার। তুমি গানের মধ্যে তার নামটি এড করে দিও। আমি তাৎক্ষনিক গাইতে থাকি।

নেদারল্যান্ডের মিঃ ফাকার সভায় আছেন বইয়া
তার কাছে ইসলাম উদ্দিন সালাম দেই পাঠাইয়া !!

বিদেশী বন্ধুর পাশেই বসে ছিলেন অভিনেতা আব্দুল কাদের। তিনি বাংলা জানেন কি না জানি না। তবে নাম উচ্ছারণের সঙ্গে সঙ্গেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে কাদের ভাইয়ের সঙ্গে বিড় বিড় করে কি জানি কি বলছেন ও দুজনেই হাসছেন। তারপর সেলিম চৌধুরী গাইলেন বাউলা কে বানাইলরে, নিশা
লাগিলরে ইত্যাদি হাছন রাজার গান। শিল্পি তুহিন গাইলেন সত্তরটা হুর চাইনা আমি। রজনী দ্বিপ্রহর অনুষ্ঠান শেষ পর্যায়ে।এবার খাওয়ার পালা। কিছু লোক ছাড়া অনেকেই ছলে গেছেন। মুরগীর বিরিয়ানী খেয়ে আমি আমার দল নিয়ে চলে যাই রাত্রী যাপনের জন্য পাঁচ তলায়। পনের বিশ মিনিট পর টেলিফোনে ক্রিং ক্রিং শব্দ। আমি ফোনটা রিসিভ করলে কে জানি বলছেন বয়াতী ভাই, স্যার আপনাকে ডাকছেন নিচ তলায় আসতে। আমি ত্বরা করে নিচ তলায় নেমে আসি। এসে দেখি একজন বাঁশি ওয়ালা আমি তাঁকে চিনিনা। স্যার আমাকে বললেন ও এখন বাঁশি বাজাবে। উপমহাদেশের খ্যাতনামা বংশী বাদক। তার বাড়িও নেত্রকোনা, নাম বারী সিদ্দিকি। তিনি  তার এক বান্ডেল বাশিঁ থেকে একটি মোটা বাঁশি হাতে নিয়ে বাজাতে শুরু করলেন। সঙ্গে একজন তবলা ওয়ালা।
কি অসাধারন সুরের লহরী তাঁর বাঁশিতে। সবাই যেন ডুবে গেলাম সেই বাশিঁর সুরে গভীর ভাব সাগরে। স্যারও খুব গভীর মনযোগ দিয়ে বাঁশি শুনছেন। এক সময় থেমে গেল তাঁর যাদুর বাঁশি। স্যার বারী ভাইকে বললেন গান শুনাাতে। বারী ভাই উকিল মুন্সির দুটি গান গাইলেন । গান শুনে সবাই অবাক। স্যার ও দর্শকগন মনে হয় সেদিন একজন অসাধারণ গায়ক ও উকিল মুন্সির মত একজন অসাধারণ বাউল সাধকের সন্ধান পেল। সবাই বায়না ধরে আরও গান শুনাার জন্য। বারী সাহেব নেত্রকোনা অঞ্চলের বাউল সাধক জালাল উদ্দিন খাঁন, সাধক রশিদ উদ্দিন ও উকিল মুন্সির বেশ কয়েকটি গান শুনালেন। রজনী শেষাংশে মুয়াজ্জিন, এর মধ্যে নিদ্রা থেকে উপাসনা উত্তম বলে আরবী ভাষায় সকল মুসলমানকে আহব্বান করিলেন। বন্ধ হল বারী সিদ্দিকির হৃদয় কাটা বিচ্ছেদ গানের সুর সঙ্গীত। সবাই চলে গেল স্ব-স্ব গন্তব্যে। এমনি ভাবেই আমরা ১৯৯৭ সালে স্যারের জন্মবার্ষিকী পালন করেছিলাম। আজ ২০১৭ সালের ১৩ ই নভেম্বর স্যারের ৬৯ তম জন্মবার্ষিকী। অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় জন্মদিন পালন করবে। সেদিনের সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন স্যার নিজেই। তিনি আর কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে না। তাকে আর পাওয়া যাবে না কোন অনুষ্ঠানের আয়োজনে অথবা প্রয়োজনে। আমাকেও আর ডাকবেন না কোন নাটক, সিনেমায় গান গাওয়ার জন্য। জন্মদিন, নববর্ষ বা পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানে আমার গান শুনবেন না কোনদিন। আমার জীবনের প্রায় বিশটি বছর স্যারের সান্যিধ্যে থাকার সৌভাগ্যে হয়েছিল। সবাই জানি তিনি চলে গেছেন অজানা গন্তব্যে। তবুও শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় কোটি ভক্তের হৃদয় মাঝে বেঁচে থাকবেন তিনি কাল থেকে কালান্তর। আজ স্যারের ৬৯ তম জন্মবার্ষিকীতে স্যারের স্মৃতির প্রতি রইল আমার বিনম্ভ্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।





বাংলানিউজ লাইন.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: