Bangla News Line Logo
bangla fonts
৪ ভাদ্র ১৪২৬, সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩:০৩ অপরাহ্ণ
facebook twitter google plus rss
সর্বশেষ
জানিয়ার চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ নেত্রকোণায় পানিতে ডুবে বৃদ্ধের মৃত্যু কেন্দুয়ায় জমি চাষের সময় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু কেন্দুয়ায় বিলে বেড়াতে গিয়ে নৌকা ডুবে শিশুর মৃত্যু নেত্রকোণায় কেরাম খেলা নিয়ে পিটুনিতে যুবক নিহত

শারদীয় দুর্গোৎসব : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব


সঞ্জয় সরকার


শারদীয় দুর্গোৎসব : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে কালের পরিক্রমায় এটি এখন আর কেবল নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপুজো এখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সর্বজনীন উৎসব। শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এ উৎসব অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। নির্দিষ্ট ধর্ম বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সূচনা হলেও উৎসব এর রূপ নিয়ে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠেছে সব সম্প্রদায়ের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সেতুবন্ধকে সুদৃঢ় করার এক অনন্য সামাজিক উৎসব।

বছরে সাধারণত তিনবার দেবী দুর্গার পুজো হয়। যেমনÑ শরতে শারদীয় দুর্গার, বসন্তে বাসন্তী দুর্গার এবং হেমন্তে কাত্যায়নী দুর্গার। তবে আদিতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হত বসন্ত কালে। একে বলা হতো বাসন্তী পুজো। পুরাণ মতে, সত্যযুগে রাজা সুরথ নিজ পাপ মোচনের জন্য বসন্তকালে দুর্গাপুজো করেছিলেন। মহাভারতের ভীষ্মপর্বেও উল্লেখ আছেÑ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয়লাভের জন্য শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ শুরুর আগে দেবী দুর্গার স্তব করার উপদেশ দিয়েছিলেন। শরৎ কালে দুর্গা পুজোর সূচনা হয় মূলত: রামায়নের কাহিনীকে অবলম্বন করে। ত্রেতা যুগে রাক্ষস রাজা রাবণকে বধ ও সীতাকে উদ্ধারের জন্য শ্রী রাম চন্দ্র শরৎ কালে (অকালে) দেবী দুর্গার পুজো করেছিলেন। অকালে হয়েছিল বলেই এর আরেক নাম অকাল বোধন। বাংলাদেশে শরৎ কালের দুর্গাপুজোই সবচেয়ে বেশী প্রচলিত। কৃষিভিত্তিক বাঙালি সমাজ শরৎকালকেই দুর্গোৎসবের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এ উপমহাদেশে কোথায় প্রথম দুর্গা পুজো হয়Ñ তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। অনেকের ধারণাÑ বর্তমানে যে পদ্ধতিতে দুর্গাপুজো হয় তার সূত্রপাত হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দী বা এরও কিছু আগে। আবার কারও কারও মতেÑ বাঙালি হিন্দুর দুর্গাপূজা শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবত  এ দুর্গোৎসবের কথা বর্ণিত হয়েছে এভাবেÑ মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্বঘরে/দুর্গোৎসবকালে বাদ্য বাজাবার তর। এতে প্রমাণিত হয় ষোড়শ শতকের আগেই দুর্গোৎসব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল। অন্যদিকে মিথিলার কবি বিদ্যাপতি রচিত দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিণী গ্রন্থেও সিংহবাহিনী দেবী দুর্গার পুজোর উল্লেখ রয়েছে। তাই বলা যায়Ñ মিথিলাতেও ষোড়শ শতকের আগেই দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। কিংবদন্তি আছেÑ শ্রী হট্টের(বর্তমানে সিলেট) রাজা গণেশ পঞ্চদশ শতকে মূর্তি দিয়ে দুর্গা পুজো করেন। এছাড়া ষোড়শ শতকে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ তার রাজ পুরোহিত পন্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর বিধান অনুযায়ী প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে মাটির মূর্তি দিয়ে জাঁকজমকভাবে দুর্গোৎসব পালন করেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাদুরিয়ার রাজা জগৎ নারায়ণ সাড়ে নয় লাখ টাকা ব্যয়ে উদ্যাপন করেন বাসন্তী দুর্গাপুজো। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র্র এবং পরবর্তীতে তার উত্তরসূরীরাও সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলেন। এভাবেই দুর্গাপুজো এক সময় হিন্দু রাজা-জমিদারদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়েছিল নব্য ধনীদের মাঝেও। তবে দেবীর আরাধনার চেয়েও তাদের কাছে মূখ্য ছিল পুজোর মধ্য দিয়ে সমাজে প্রভুত্ব বিস্তার ও ঐশ্বর্য প্রদর্শনের বিষয়টি। কিন্তু বিশ শতকে এসে দুর্গোৎসবকে সর্বজনীন রূপ দিয়েছে বাঙালিরা। এ সময়ে ব্যক্তিগত পুজোর পাশাপাশি ব্যাপকভাবে প্রচলন ঘটতে থাকে বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গোৎসবের। এর পর থেকে দুর্গাপুজো আর বিশেষ কোন শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হাজার বছরের জাত-পাতের বিভেদ চুরমার করে দিয়েছে এ কালের সর্বজনীন দুর্গোৎসব। তথাকথিত উচু-নীচুদের মধ্যে রচনা করেছে মহা ঐক্যের ভিত। এ পুজোয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ভালবাসার এক অকৃত্রিম বন্ধনে মিলিত হয়। অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দেয় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়।

প্রতিমায় দেবী দুর্গাকে নারী রূপে দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি নারী বা পুরুষ কোনটাই নন। পুরাণ মতে, তিনি এক অভিন্ন স্বত্ত্বা বা মহাশক্তি। সকল দেব-দেবীর সমন্বিত পরমাশক্তি। তিনি বহুরূপিনী। তিনিই ভগবতী, চন্ডী, উমা, পার্বতী এবং আদ্যশক্তি মহামায়া নামে পরিচিত। জীব ও জগতের কল্যাণের লক্ষ্যে একেক সময় তিনি একেক নামে বা রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছেন। আসলে তিনি আদি শক্তি, ব্রহ্ম সনাতনী। শক্তি অর্থে ব্রহ্মার মহাশক্তিকে বোঝায়। এ শক্তি অনাদি, অনন্ত। তার বিস্তৃতি সর্বব্যপী। সকল দুর্গতি বিনাশ করেন বলে তিনি দুর্গতি নাশিনী। দুঃখকে নাশ করেন বলে তিনি দুর্গা। আবার অনেকের মতে, স্বর্গ রাজ্যের শাস্তি বিনাশকারী দুর্গ নামক এক মহা পরাক্রমশালী দৈত্যকে বধ করার কারণে তিনি দুর্গা নামে অভিহিত। সে যা হোকÑ শত্রুর কাছে তিনি সর্বদাই সংহাররূপিনী, আবার ভক্তের কাছে আনন্দময়ী, স্নেহময়ী জননী ও কল্যাণপ্রদায়িনী।

পুরাণ তন্ত্রানুসারে, দেবী দুর্গা তাঁর স্বামীগৃহ কৈলাস থেকে বছরের এই সময়ে সপরিবারে পৃথিবীতে বেড়াতে আসেন। তাঁর সঙ্গে আসেন চার সন্তানÑ লক্ষ্মী, স্বরস্বতী, কার্ত্তিক ও গণেশ। লক্ষ্মী ধন-সম্পদের প্রতীক, স্বরস্বতী বিদ্যা-বিজ্ঞানদায়িনী, গণেশ সর্ব কাজের সিদ্ধিদাতা এবং কার্ত্তিক শৌর্যবীর্যের প্রতীক। এ যেন পৃথিবীর জন্য এক মহা আয়োজন। তাদের সকলের আগমণের উদ্দেশ্য জীব ও জগতের সুখ, শান্তি এবং অসুর-অশুভের বিনাশ। দুর্গার পদতলে পদদলিত থাকে অশুভের প্রতীক অসুর। সিংহের ওপর দাঁড়ানো দেবীর দশহাতে থাকে দশ অস্ত্রÑ ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, তীক্ষèবান, শক্তি, ঢাল, ধনু, পাশ, অংকুশ ও কুঠার। দশ হাতে দশ দিক রক্ষা করেন বলেই তিনি দশভূজা।

একটি আশার কথা, বাংলাদেশের শারদোৎসবে দিন দিন নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। প্রতিমা তৈরি, আলোক সজ্জা, তোরণ নির্মাণসহ সব কিছুতেই বেড়েছে এর জাঁকজমকতা। দেবীর আরাধনাকে শুধু ধর্মীয় আঙ্গিকে এবং পুজো ম-পের মাঝে আবদ্ধ না রেখে আমাদের যুব সমাজ এটিকে পরিণত করেছে সকল ধর্ম-মতের মানুষের সামাজিক উৎসব-এ। পুজোকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ঢাক-ঢোলের বাদ্য-বাজনা ও আরতিনৃত্য চলে, তেমনি এর পাশাপাশি চলে নানা সামাজিক কর্মকা-ও। সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব এখন সকল বাঙালির উৎসব। বাঙালি মাত্রই আপ্লুত হয় পুজোর আনন্দে। উভয় ধর্মের কিছু সংখ্যক ধর্ম ব্যবসায়ী, ধর্মান্ধ বা মৌলবাদী চরিত্রের অপতৎপরতার কথা বাদ দিলেÑ বাঙালি মাত্রই যে উদারচেতা, উৎসব প্রিয়, অসাম্প্রদায়িক এবং পরষ্পরের সঙ্গে নিবিড় ভালবাসায়, ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধÑ মুসলিমদের পবিত্র ঈদ এবং হিন্দুদের শারদোৎসবে তা আজ জ্বলজ্বলে ভাবে প্রমাণিত।

    জগজ্জননী দেবী দুর্গার আগমণে আমাদের সকল দুঃখ-কষ্ট-হিংসা-দ্বেষ দুর হোক। পরাজিত হোক সকল অশুভ শক্তি। সকলের দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়–ক পবিত্রতা। সবখানে ছড়িয়ে পড়–ক শান্তি-সুখের বারতা। সত্য-সুন্দরের আলোয় আলোকিত হোক পৃথিবী। এই হোক কামনা আমাদের।

 

(লেখক :সঞ্জয় সরকার : সাংবাদিক, ছড়াকার,[email protected])

 

 

বাংলানিউজ লাইন.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: