Bangla News Line Logo
bangla fonts
৪ ভাদ্র ১৪২৬, সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১:৩৪ অপরাহ্ণ
facebook twitter google plus rss
সর্বশেষ
জানিয়ার চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ নেত্রকোণায় পানিতে ডুবে বৃদ্ধের মৃত্যু কেন্দুয়ায় জমি চাষের সময় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু কেন্দুয়ায় বিলে বেড়াতে গিয়ে নৌকা ডুবে শিশুর মৃত্যু নেত্রকোণায় কেরাম খেলা নিয়ে পিটুনিতে যুবক নিহত

চিটায় স্বপ্ন ভঙ্গ নেত্রকোণার হাওরপাড়ের কৃষকদের


নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলানিউজলাইন ডটকম:1:43:20PAM04/30/2019


চিটায় স্বপ্ন ভঙ্গ নেত্রকোণার হাওরপাড়ের কৃষকদের

নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে  ধানে চিটা দেখা দেয়ায় কৃষকদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে। ঠান্ডাজনিত রোগ কোল্ড ইনজুরির কারণে ধানে দানা না হওয়ায় ফলনের অর্ধেকই হচ্ছে চিটা বলছেন হাওর পাড়ের কৃষকেরা।

 জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়,  এবার নেত্রকোণায় এক লাখ ৮৪ সহাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদ হয়েছে।জেলার হাওর এলাকা মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার পুরো জমি ছাড়াও কলমাকান্দা ও আটপাড়া উপজেলার একাংশ এলাকায় রয়েছে  এক ফসলি বোরো আবাদি জমি।  এই হাওরাঞ্চলে এবার বোরো আবাদ হয়েছে ৪০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে  ১৭ হাজার হেক্টর  জমিতে আগাম ব্রি-ধান ২৮ আবাদের ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে  দেখা দিয়েছে চিটা।  

 সরেজমিন দেখা গেছে, বোরোধান কাটা মাড়াইয়ে ধুম লাগার কথা এই সময়ে ।মাঠজুড়ে সোনালী ধান দোল খেলেও  ধানে চিটা থাকায়  কৃষকেরা  এই ধান  কেটে আনতে আগ্রহী হচ্ছেননা। কৃষকেরা বলছেন, মাঠের ধান কাটতে যে খরচ তাই উঠছেনা।

খালিয়াজুরীর পাংগাসিয়া, কির্তনখোলা, কটিচাপরা, সেনের বিল, জালর বন, সোনাতোলা, বল্লীর চৌতরা, জগন্নাথপুরের বড় হাওর, বাজজোয়াইল, পাঁচহাট, নগর, বোয়ালী, চাকুয়ার হাওরের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসলে ধানের বদলে হয়েছে চিটা।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হাওরের জমিতে ফসল আবাদে সব সময় বৈরী প্রকৃতি ও আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকেন তারা। পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে আগাম বন্যায় তলিয়ে যায় কৃষকের সোনালী ফসল। এসব কারণে  আগাম ব্রি-ধান ২৮ আবাদে আগ্রহ বেশি তাদের। ডিসেম্বরের শুরুতেই হাওরের নীচু জমিতে আবাদ শুরু করেন দ্রুত ফলন ঘরে তুলতে।

খালিয়াজুরীর সদরের কৃষক মোঃ রাজু মিয়া । তিনি ২০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। এর মধ্যে  চিটা হয়েছে ১১ একর জমিতে। একই উপজেলার বল্লী গ্রামের বাবুল মিয়া ১৫ একর জমি চাষ করেছেন।  তার আবাদ করা  ১৩ একর জমিই কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে। একই গ্রামের নেহের মিয়া ৭ একর জমি চাষ করলেও তার পুরো জমির ফসলেই চিটা আর চিটা।   খালিয়াজুরীর রফিকুল ইসলাম ছোটনের ৬ একরের মধ্যে ৩ একর ,জাহের মিয়ার ৩ একরের মধ্যে ২ একর , গছিখাই গ্রামের শফিকুলের ১৫ একরের মধ্যে ১০ একর জমির ফসলে দেখা দিয়েছে চিটা । এ রকম চিত্র শুধু খালিয়াজুরীতে নয়। মদন, মোহনগঞ্জ , কলমাকান্দা ও আটপাড়ার হাওরের জমিতেও দানাহীন চিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগাম  ব্রি-ধান ২৮ জাতের ধান গাছ।

কৃষকেরা বলেছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় ধানের পাকার সময়ে ধানের ভারে শীষ নিচের দিকে ন্যূয়ে থাকে। কিন্তু আক্রান্ত কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা গেছে,  এসব জমির ধানের শীষ সোজা হয়ে উপরের দিকে দাঁড়িয়ে আছে। শীষের মধ্যে কিছু ধান থাকলেও দানাহীন চিটাই বেশি। এ সময় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা জানান, বিগত বছরগুলোতে এক একর জমিতে  আগাম জাতের ব্রি-ধান ২৮ আবাদ করে গড়ে  ৬০ মণ ধান পেয়েছেন। এবার গড়ে একরে ১০ মণ ধানও পাচ্ছেন না।খালিয়াজুরী সদরের কৃষক কাচু মিয়া জানান, তিনি ৮ একর জমিতে ব্রি ধান-২৮ মাড়াই করে ৮০ মণ ধান পেয়েছেন। অথচ ধানে চিটা না হয়ে স্বভাবিক ফলন হলে তার এ জমিতে কমপক্ষে ৩৬০ মণ থেকে ৪০০ মণ ধান উৎপাদিত হতো।   এতে করে  উৎপাদন খরচ উঠছেনা।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে  কৃষকেরা নেত্রকোণার হাওরে বোরো আবাদ করেন। ফলন শেষে ধান কর্তন করে ফিরে যান তারা। এরকম কৃষক  মোঃ হারুন-অর-রশিদ এবার খালিয়াজুরীতে আবাদ করেছেন ৭০ একর ।  তার ৩০ একর জমির বোরো ফসলই কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে ফলনে চিটা হয়ে গেছে।

ফলনের  এই বপির্যয়ে  হাওরপাড়েরর কৃষকদের দু:শ্চিন্তায় এখন গুমাতে পারছেননা। তারা বলছেন, বছরের এই একটি ফসলের ওপর তাদের জীবীকা নির্ভর করে। সামনের দিন কিভাবে পাড়ি দিবেন তারা জানেননা। এছাড়াও ধার দেনা করে আবাদ করেছেন এই বোরো ফসল। কিভাবেই শোধ করবেন দেনা তার উত্তরও জানা নেই তাদের।

খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান হেকিম  বলেন , সমস্যা যেন কৃষকের পিছু ছাড়ছেনা। সাধারণত এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনি ঋণ নিয়ে হাওরের কৃষকরা জমি চাষাবাদ করেন। কিন্তু এবার ফসল বিপর্যয় হওয়ায় অনেক কৃষকের পক্ষে গরু, বাছুর, বাড়িঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

খালিয়াজুরী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া জব্বার বলেন, বিগত ১৫ বছরে এখানে অকাল বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও রোগবালাইয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে ৯ বার। এবার ক্ষতি হলো চিটায়। একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল এ হাওর পাড়ের চিটায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান  বলেন, জমিতে ধানের প্রজনন পর্যায়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রার প্রয়োজন ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে ধানের প্রজননের ওই সময়টিতে তাপমাত্রা ছিল ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেরও নিচে। এর ফলে জমির ফসল ঠান্ডাজনিত রোগ কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। ডিসেম্বরের ৩য় সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে  বপন করলে ওই ধানে কোল্ড ইনজুরি রোগ অনেকটা এড়ানো যেত।

তিনি বলেন,প্রয়োজনীয় সময়ে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম থাকায় ধানের মধ্যে ঠিকমতো দানা গঠন হয়নি। এর ফলে অনেক জমিতে চিটা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদেরকে সহায়তার জন্যে সরকারের উর্ধ্বতন মহলে জানানো হবে।

বাংলানিউজ লাইন.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: