Bangla News Line Logo
bangla fonts
৪ ভাদ্র ১৪২৬, সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯, ২:১১ অপরাহ্ণ
facebook twitter google plus rss
সর্বশেষ
জানিয়ার চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ নেত্রকোণায় পানিতে ডুবে বৃদ্ধের মৃত্যু কেন্দুয়ায় জমি চাষের সময় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু কেন্দুয়ায় বিলে বেড়াতে গিয়ে নৌকা ডুবে শিশুর মৃত্যু নেত্রকোণায় কেরাম খেলা নিয়ে পিটুনিতে যুবক নিহত

খাদ্যে রাসায়নিক ব্যবহারে মানবদেহের ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিকার



খাদ্যে রাসায়নিক ব্যবহারে মানবদেহের ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিকার

বিলাস চন্দ্র পাল (লেখক পেশায় কৃষিবিদ)

“ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই

ভেজাল সারা দেশটায়

ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকি চেষ্টায়!

খাঁটি জিনিস এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে

ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল, আর সকলই মিথ্যে।”

সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের অমিল খুঁজে পাওয়া ভার। এখন নাগরিক জীবনের অন্যতম উদ্বেগের নাম ‘ভেজাল’। রসাল ফল, সুস্বাদু মাছ অথবা মজাদার খাবার এখন মানুষের মৃত্যৃর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যঃ

ফরমালিন, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, পোড়া মবিল, রং, সোডিয়াম কার্বাইড, ইথাইলিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, হাইড্রোজ, ডিডিটি ইত্যাদি।

সরিষার তেলে ঝাঁজ বাড়ানোর ব্যবহার করা হয় এক ধরণের কেমিক্যাল। মুরগির খাবারে ট্যানারির বর্জ্য, ভয়ঙ্কর বিষাক্ত রাসায়নিক যুক্ত চামড়ার ভুসি ব্যবহার করা হচ্ছে এতে মুরগির মাংস ও ডিম বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। সোডিয়াম কার্বাইড মূলত ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে। কাঁচা আম, কাঁঠাল, লিচু, কলায় বেশি ব্যবহার হয় এ রাসায়নিক পদার্থ। সিরিঞ্জ দিয়ে তরমুজের ভেতরে দেয়া হয় তরল পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। এর ফলে তরমুজের ভেতর থাকে লাল টকটকে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় কলা।

কোন কোন খাদ্যে ভেজাল মেশানো হচ্ছে : ফলে, মাছে ফরমালিন। অপরিপক্ক টমেটো হরমোন দিয়ে পাকানো হচ্ছে।  পচনরোধে বিষাক্ত ফরমালিন, তাজা দেখাতে মাছে রেড অক্সাইড, ফলমূল ও শাকসব্জিতে কার্বাইড মিশানো হয়ে থাকে। সাধারণত কাঁচা কলাকে ইথাইলিন গ্যাস দ্বারা পাকানো হয়। কাঁচা মৌসুমী ফল যেমন আম, কলা, পেঁপে, নাশপাতি, কুল ও আপেলকে ক্যালসিয়াম কার্বাইড নামক বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকায়।

মাছে ও দুধে ফরমালিন, ফলমূলে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল, সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, জিলাপি-চানাচুরে মবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংক্স, জুস, সেমাই, আচার, নুডুলস এবং মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং, মুড়িতে ইউরিয়া-হাইড্রোজ, পানিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই। ভেজাল খাবার খেয়ে আমরা জাতিকে ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি, নতুন প্রজন্মকে মেধাহীন পঙ্গু জীবনের মতো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছি।
খেজুরেও ফরমালিন দেয়া হচ্ছে।  খাবারে ফরমালিন, বস্ত্রকলের বিষাক্ত রং এবং ইউরিয়া সার মেশানো হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আম, পেঁপে, পেয়ারা, আনারস, জাম, জামরুল, তরমুজ, বাঙ্গি, আপেল, আঙ্‌গুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। সাধারণত ফলমূলের উজ্জ্বল রং বা নজরকাড়া রূপ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এগুলো বেশি দামে বিক্রি হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দোকানিরা এসব ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশাচ্ছেন।
ভেজালের ক্ষতিকর প্রভাব: মাছ, মাংস, ফল এবং দুধে ফরমালিন প্রয়োগের ফলে ক্যান্সার, হাঁপানি এবং চর্মরোগ হয়। শিশু ও গর্ভবতী মায়ের জন্য এর ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মক। অতি অল্প পরিমাণ ফরমালডিহাইড গ্যাস ব্যবহারও ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়ার সংক্রমণের কারণ। ফরমালিন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা গ্রহণের ফলে মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে।

বাংলাদেশ ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালকের মতে, মানবদেহে নানা ধরণের ক্যান্সার হয়ে থাকে। যেগুলোর অধিকংশই কারণ জানা যায়নি। তবে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক যে ক্যান্সারের বিস্তারে সক্ষম তা প্রমাণিত। এর ফলে পাকস্থলীতে প্রদাহ, লিভারের ক্ষতি, অস্তি-মজ্জা জমে যায়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস সোসাইটির দেয়া তথ্য মতে, ভেজাল খাদ্য খেয়ে দেশে প্রতি বছর তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস ও ২ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কার্বাইডের কারণে তীব্র মাথা ব্যাথা, ঘূর্ণি রোগ, প্রলাপ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটা মেজাজ খিটখিটে এবং স্মরণশক্তি ক্ষতি করতে পারে। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ফলে কিডনি, লিভার, ত্বক, মূত্রথলি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে।

ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে। বয়স্ক লোকেরাও এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষ-ত্রুটিসহ আশঙ্কাজনকহারে প্রতিবন্ধী, হাবাগোবা, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।

ভেজাল খাদ্যে মানব দেহে যা ঘটছে : ভেজাল ও বিষ গ্রহণের ফলে মানবদেহে নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। যেমন ক্যান্সার, লিভার রোগ, কিডনি রোগ এবং রক্ত শূন্যতা ইত্যাদি নানা রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলেছে।

ফরমালিন মেশানো দ্রব্য চেনার উপায়:

একটু সতর্ক হলে কেনার আগে ক্রেতা বুঝতে পারবেন মাছে ফরমালিন দেয়া আছে কিনা। ফরমালিন দেয়া মাছের গায়ে পিচ্ছিলভাব থাকবে না, মাছের গা খসখসে হবে, চোখের মণি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ না হয়ে ঘোলা আর মলিন দেখাবে, কানকো লালের বদলে হালকা বাদামি হবে (অবশ্য অনেক বিক্রেতা ফরমালিন দেওয়ার পর এটি লাল দেখানোর জন্য অন্য মাছের রক্ত কিংবা লাল রং লাগিয়ে রাখে) । রান্নার পর এই মাছে স্বাভাবিক স্বাদ পাওয়া যাবে না, বিশেষ করে মাথা ও পেটের অংশ অত্যন্ত বিস্বাদ ও রাসায়নিক গন্ধযুক্ত হবে।

একই ভাবে ফরমালিন দেয়া দুধের তৈরি মিষ্টিতে দুধের স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যাবেনা, তার বদলে রাসায়নিক গন্ধ ও স্বাদ পাওয়া যাবে। ফরমালিন দেয়া আঙ্গুরের গায়ে মৌমাছি বসবে না, আঙ্গুরের মিষ্টি সুগন্ধ পাওয়া যাবে না। আপেল নাশপাতির বেলাতেও এই সুগন্ধ থাকবে না। আগে দোকানে আঙ্গুর ঝুলিয়ে রাখলে একদিন পরই আঙ্গুর একটা-দুটা খসে পড়তো, এখন ফরমালিন দেয়ার কারণে পচে না ও পড়ে না। আপেল নাশপাতিও দিনের পর দিন একারণেই পচে না। কোনো মাছের বা ফলের দোকানে ক্রেতার চোখ বা নাকে ঝাঁজ লাগলে বুঝতে হবে এখানে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়।

কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল চেনার উপায়:

১. উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আম কাটার পর চামড়ার ঠিক নিচে ফলের অংশ কাঁচা পাওয়া যাবে। যদিও চামড়াটি পাকা রংয়ের বর্ণ ধারণ করেছিল।
২. যদি ঝুঁড়িতে বা দোকানে সবগুলো ফল একই সময়ে একইরকম পাকা দেখা যায় এবং দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ফলের চামড়ায় আঁচিল বা তিলের মতো রং দেখা যায়।
৩. প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যে ফল পাকে তাতে মাছি বসবে কিন্তু কেমিক্যাল দ্বারা পাকানো হলে সে ফলে মাছি বসবে না।
৪. প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফলের চামড়া উঠানোর পর এক ফোঁটা আয়োডিন দিলে তা গাঢ় নীল অথবা কালো বর্ণ ধারণ করে। কিন্তু কেমিক্যাল দ্বারা পাকানো ফলে এই আয়োডিনের রং অপরিবর্তিত থাকে।
আমাদের করণীয়:

ফল খাওয়ার আগে কয়েক মিনিট পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। মৌসুমের আগে বাজারে যে পাকা ফলগুলো আসে সেগুলো ধরেই নিতে হবে এগুলো কেমিক্যাল দ্বারা পাকানো হয়েছে। যখন আম এবং আপেল জাতীয় ফল খাবেন তখন এগুলো টুকরো টুকরো করে খাবেন।


ফর্মালিন অপব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহঃ
অসাধু ব্যবসায়ীরা যে সমস্ত পচনশীল খাদ্যের বাহ্যিক চেহারাতে টাটকা ভাব ও দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করার জন্য ফর্মালিন ব্যবহার করে মাছ তার মধ্যে অন্যতম। এছাড়া অপব্যবহারের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলির মধ্যে আছে- শুটকি মাছ, ফল-ফলাদি, তরকারী, কাঁচা গোশত, দুধ ইত্যাদি।
কিভাবে মাছ থেকে ফর্মালিন দূর করবেন?
১। পরীক্ষায় দেখা গেছে পানিতে প্রায় ১ ঘন্টা মাছ ভিজিয়ে রাখলে ফর্মালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়।
২। লবনাক্ত পানিতে ফর্মালিন দেওয়া মাছ ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফর্মালিনের মাত্রা কমে যায়।
৩। প্রথমে চাল ধোয়া পানিতে ও পরে সাধারন পানিতে ফর্মালিন যুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফর্মালিন দূর হয়।
৪। সবচাইতে ভাল পদ্ধতি হল ভিনেগার ও পানির মিশ্রনে (পানিতে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফর্মালিনই দূর হয়।
৫। এছাড়া ফর্মালিন শনাক্তকরণের রাসায়নিক দ্রব্যও বাজারে আজকাল পাওয়া যায় সুলভ মুল্যে ।

কিভাবে ফল সবজি থেকে ফর্মালিনের দূর করবেন ?

 খাওয়ার আগে ১০ মিনিট গরম লবণ পানিতে ফল ও সবজি ভিজিয়ে রাখতে হবে।

ফর্মালিন মানব দেহের কোন কোন অঙ্গে ক্ষতি করে?
• স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে
• কৌলিতাত্ত্বিক গুনাগুণের বৈকল্য সাধন করে (Genotoxicity)
• পরিপাকে তীব্র অম্লীয় প্রভাব ফেলে
• রক্ত সংবহনতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বিনষ্ট করে দেয়
• তীব্র রেচন জনিত (বৃক্ক তথা কিডনিতে) সমস্যা সৃষ্টি করে
• স্বাভাবিক স্নায়ুবিক সংবেদনশীলতা নষ্ট করে
• ক্যান্সার সৃষ্টিতে উদ্দীপক এজেন্ট হিসাবে কাজ করে
ফর্মালিন কিভাবে ক্ষতি করে?
• সাধারণতঃ ফর্মালিনযুক্ত মাছ বা ফলমূল খেলে-
o মাথা ব্যথাসহ শ্বাসকষ্ট
o ফর্মালিন মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়
o মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।
o ডাইরিয়া, পেটব্যথা, বমি, চর্মরোগ
o অজ্ঞান ও অচেতন করে ফেলা
o কিডনির ক্ষতি ও অকালমৃত্যু এমনকি ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে
o তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে।
o গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।
o ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
• শ্বাসকালে ফর্মালিনযুক্ত (ফরমালডিহাইড গ্যাস) বায়ু গ্রহণের ফলে-
o হাঁচি, কাশি, কণ্ঠনালীতে অম্লীয় অনুভূতি
o শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত কম হওয়া ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া
o পালমোনারী ইডেমা (ফুসফুসে তরল পদার্থ জমে স্ফীত হওয়া, বুকে ব্যথা ও শ্বাস নেয়ার হার কমা) হতে পারে
o সাধারণত যারা ফর্মালিন নিয়ে কাজ করেন তাদের নাকের প্রদাহ, শ্বাস কষ্ট এবং চর্ম প্রদাহ দেখা দেয়।
o গর্ভবতী মহিলাদের ফর্মালিন নিয়ে কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিতান্তই যদি পেশাজনিত কারণে কাজ করতে হয় তবে Formaldehyde Respirator ব্যবহার করে কাজ করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ভ্রূণের অস্বাভাবিকতা, গর্ভপাত, গর্ভস্রাব, প্রজননক্ষমতা হ্রাস এবং প্রসবজনিত অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয় বলে কয়েকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ত্বকের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রবেশ করলে-
o ত্বকের শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়
o ক্ষত ও জ্বালা পোড়ার অনুভূতি সৃষ্টি
o এমনকি ত্বক সাদা হয়ে যাওয়াও সম্ভব

দীর্ঘকাল ফর্মালিনের সংস্পর্শে থাকায়-
o ত্বক পুড়ে যাওয়া
o ত্বকে অনুভূতিহীনতা
o ত্বক শক্ত হয়ে যাওয়া
o ফোস্কার ন্যায় দাগ হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণিত
o শিল্প শ্রমিকদের উপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দেখা যায় যে, ফরমালডিহাইডের সংস্পর্শে যারা প্রায়শ কাজ করেন তাদের ন্যাজাল ক্যান্সার, ন্যাজোফেরেঞ্জিয়াল ক্যান্সার ও লিউকেমিয়া হওয়ার প্রবণতা বেশী। National Cancer Institute, USA এর একাধিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, এনাটমিস্ট এবং অ্যাম্বালমার (যারা মৃতদেহ সংরক্ষণের কাজ করে) পেশার যারা ফর্মালিন নিয়ে কাজ করেন তারা সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় লিউকেমিয়া এবং ব্রেন ক্যান্সারের উচ্চ ঝুঁকি মধ্যে রয়েছেন।

চোখে সামান্য ফর্মালিন গ্যাসের সংস্পর্শে এলেও যা হতে পারে-
o চোখে জ্বালা পোড়া সৃষ্টি
o ঝাপসা দৃষ্টি
o দৃষ্টিহীনতা
o আর সরাসরি চোখে ফর্মালিন লাগলে চোখের স্থায়ী অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে

ফর্মালিন প্রতিরোধ করার উপায়:
জনসচেতনতা সৃষ্টি
খাদ্য দ্রব্যের উপাদানসমূহ পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ
ফর্মালিন ক্রয়-বিক্রয়ে শর্তারোপ
মাছ সংরক্ষণে আরও বরফ কল ও হিমঘর নির্মাণ
সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ

বসতবাড়িতে সারাবছরব্যাপী ফল ও সবজি উৎপাদন

সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপণার মাধ্যমে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার করে নিরাপদ সবজী উৎপাদন।

ভেজাল বিরোধী আইনসমূহ: ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই। কিন্তু আইনগুলোর অধীনে সামান্য কিছু জরিমানা ও দু-এক মাসের কারাদন্ড ছাড়া বড় কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। ভেজাল পণ্য উৎপাদন রোধে বিশুদ্ধ খাদ্য আইনে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তির বিধান আছে। এ আইন করা হয় ২০০৫ সালে। এর আগে একই নামে একটি অধ্যাদেশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এ আইনে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়নি। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো নিয়ে দ- বিধি ১৮৬০, বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯, বিশুদ্ধ খাদ্য নীতিমালা ১৯৬৭, বিশুদ্ধ খাদ্য আইন (সংশোধিত) ২০০৫, ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯, পয়জনস অ্যাক্ট ১৯১৯, ভোক্ত অধিকার আইন ২০০৯ সহ আরো অনেক আইন রয়েছে।

রাসায়নিক আমদানিকারক: প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফরমালিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করা হয়। কিন্তু সেগুলো কোথায় বিক্রি করা হয় তার সুষ্ঠু হিসাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। এসব রাসায়নিক দ্রব্যসমূহ খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। আর সেগুলো প্রতিনিয়ত ব্যবহার করা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যে। কিন্তু আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

ভেজাল সমস্যার প্রতিকার: ভেজাল প্রতিরোধে নিন্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়-

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা: বাংলাদেশে ভেজাল দূর করতে হলে প্রথমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪’ এর ২৫ (গ) ধারায় খাদ্যে ভেজালের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। অব্যবহৃত আইন ব্যবহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আইনের প্রয়োগ: বাংলাদেশে ভেজাল প্রতিরোধে বহু আইন আছে। কিন্তু আইনে তেমন প্রয়োগ নেই। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যদি শাস্তি নিশ্চিত করা হয় তাহলে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হবে।

রাসায়নিক আমদানির ওপর নজরদারি: সরকারের নীতি নির্ধারণী ফোরামে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক আমদানির উপর পর্যাপ্ত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে আমদানিকৃত রাসায়নিকের ব্যবহার যাতে সীমিত থাকে সেজন্য নীতিমালা প্রণয়ন করে সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে।

ভোক্তা আন্দোলন জোরদার: ভারতে ভোক্তা আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্ত। সেখানে পণ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে ভোক্তা অধিকার কর্মীরা এগিয়ে আসেন। ওই পণ্য বা সেবা বয়কটের আহ্বান জানানো হয়। ফল পাওয়া যায় দ্রুতই। কিন্তু বাংলাদেশে এমন আন্দোলন শুধুই স্বপ্ন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে। ভেজালবিরোধীদের সামান্য জরিমানা করলে কাজ হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

বিএসটিআই (BSTI) এর ভূমিকা: বিএসটিআই (Bangladesh standard and Testing Isntitution) কর্তৃপক্ষের উচিত পণ্যের মান নিশ্চিত করে অনুমোদন দেওয়া। তাছাড়া বিএসটিআইএর কর্তৃপক্ষের কেউ দুর্নীতিগ্রস্থ হলে তার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সরকারি পর্যায়ে আরও কিছু করণীয়-

ক. দেশের বিদ্যমান আইনগুলোকে যুগোপযোগী ও আরো কঠিন শাস্তির বিধান এবং বাস্তবে তা প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

খ. খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা কঠোর করা।

গ. উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের পৌঁছানোকে ক্রমাগত পরিদর্শনের আওতায় আনা।

ঘ. বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা।

ব্যবসায়ীদের করণীয়-

ক. অসৎ খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

খ. অসাধু ব্যবসায়ীদের পক্ষে সমগ্র ব্যবসায়ী সমাজের এক হয়ে কথা বলা বন্ধ করতে হবে।

ভোক্তা পর্যায়ে করণীয়-

ক. ভোক্তাদেরকে সংগঠিত হয়ে খাদ্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

খ. ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

গ. ভেজালযুক্ত খাদ্যদ্রব্য বয়কট করতে হবে।

 

উপসংহার: সন্দেহাতীতভাবে খাদ্যে ভেজাল একটি জাতীয় সমস্যা, জাতীয় বিপর্যয় এটা আমাদের সবাইকে বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদেরকে সর্বাগ্রে সত্যিকারভাবে অনুধাবন করতে হবে। মনে রাখতে হবে- “Medicine is not healthcare rather than sick care, Food is healthcare.” কাজেই সুস্থ থাকার জন্য ভেজালমুক্ত খাবারের বিকল্প নেই।

( লেখক : কৃষিবিদ,উপ পরিচালক,কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর,খামারবাড়ি, নেত্রকোণা-[email protected]

বাংলানিউজ লাইন.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: